ইসলাম কি?
ইসলাম কি?
আসলে আমাদের জানতে হবে ইসলাম কি?
যে কোনো কিছু নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই সেটা কাকে বলে তা ঠিক করতে হয়। তাতে আলোচনার সুবিধে হয়। আসলে কুরআন ও হাদীসের আলোকে ইসলাম কি? জানার চেষ্টা করছি।
আভিধানিক অর্থেঃ
ইসলাম শব্দটি(আরবি ভাষায়: الإسلام আল্-ইসলাম্) "ইসলাম" শব্দের অর্থ "আত্মসমর্পণ",ইসলাম অর্থঃ- শান্তি ও নিরাপত্তা।
পারিভাষিক অর্থেঃ
আর ধর্মীয় পরিভাষায় ইসলামের অর্থ সারা বিশ্বের সৃস্টিকর্তা করুণাময় আল্লাহ তায়ালার নিকট আত্মসমর্পণ করা ও তাঁহার বিধি-বিধানগুলোকে পালন করা। আল্লাহর প্রেরিত নবী ও রাসুলগণ মানবজাতির পরিপূর্ণ কল্যানের জন্য যে আদর্শ এবং সুষ্ঠ জীবন যাত্রার ব্যবস্থা শিক্ষা দিয়েছেন তাহাই ইসলাম।
ইসলাম সর্ম্পকে কুরআন কি বলেঃ
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমের সূরা ইমরানের ১৯ নং আয়াতে ইরশাদ করেন।إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللّهِ الإِسْلاَمُ وَمَا
اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوْتُواْ الْكِتَابَ إِلاَّ مِن بَعْدِ مَا جَاءهُمُ
الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ وَمَن يَكْفُرْ بِآيَاتِ اللّهِ فَإِنَّ
اللّهِ سَرِيعُ الْحِسَابِ
নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র
ইসলাম। এবং যাদের প্রতি কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও
ওরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ, যারা আল্লাহর
নিদর্শনসমূহের প্রতি কুফরী করে তাদের জানা উচিত যে, নিশ্চিতরূপে আল্লাহ
হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত দ্রুত।
ইসলাম সর্ম্পকে হাদিস কি বলেঃ
(উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) কতৃর্ক বণির্ত) “একদিন হজরত জিব্রাইল আ: মানুষের বেশে নবীজীর কাছে আসিলেন এবং বলিলেন, হে নবী। ইসলাম কাহাকে বলে?” তিনি বলিলেন, “ইসলাম হইল, তুমি আলাহ্’র ইবাদত করিবে এবং কাহাকেও শরিক করিবে না, নামাজ প্রতিষ্ঠা করিবে, জাকাতকে ফরজ হিসাবে পালন করিবে” (সহি বুখারি ও মুসলিম, ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা ৭৩৩, নোট ১, এবং মিশকাতুল মাসাবিহ্ ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ২৩-২৫, নং ২(১)-এর সূত্রে বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা ৪৯৮)। একই প্রমাণ দেখুন হাদিস কুদসি।এতক্ষণ আমরা জানার চেষ্ঠা করেছি আসলে ইসলাম কি? এখন আমরা জানার চেষ্টা করব।আমাদের দেশে ইসলাম কিভাবে এসেছে।
বাংলার সহস্রাধিক বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলাম ধর্ম এবং মুসলিম জীবনাচার এদেশের সমাজ ও জনজীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। তবে বাংলায় ইসলামের আবির্ভাব ও মুসলমানদের আগমন সর্বপ্রথম ঠিক কখন হয়েছিল সঠিকভাবে তা নির্ধারণ করা দুঃসাধ্য। তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশে বহির্জগত থেকে যেসব মুসলমান আগমন করেছিলেন, তাদেরকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়।
এক শ্রেণীর মুসলমান ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগমন করে ইসলামের বাণী প্রচার করেন। অনুরূপভাবে আসেন কিছু ফকির ও অলী-দরবেশ। তারাও কেবলমাত্র ধর্ম প্রচারের কাজে জীবন অতিবাহিত করেন এবং এ অঞ্চলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিজ নিজ চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি অনুসারে ইসলাম প্রচারকারী এসব অলী দরবেশদের অনেকেরই মাজার রয়েছে বাংলাদেশে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনঃ হযরত শাহ জালাল (রহঃ), হযরত শাহ পরান (রহঃ), হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহঃ) সহ আরো অনেক অনেক অলি আউলিয়া ।
আর এক শ্রেণীর মুসলমান এদেশে এসেছিলেন দেশ জয়ের অভিযানে। তাদের বিজয়ের ফলে
বাংলা অঞ্চলে মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলায়
মুসলমানদের আগমন দূর অতীতের কোন এক সময় হয়ে থাকলেও তাদের রাজনৈতিক
প্রতিষ্ঠার সূচনা হয় ১২০৩ সাল মোতাবেক ৬০০ হিজরী সাল থেকে।
প্রায় সব ইতিহাসবিদই এই মর্মে একমত যে, ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়েই বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা হয় এবং প্রধানত ঐ সময় থেকেই অব্যাহত গতিতে ভারতের পশ্চিমাঞ্চল, আফগানিস্তান, ইরান, আরব ও তুরস্ক থেকে অসংখ্য মুসলমান বাংলায় আগমন করতে থাকেন। এদের অধিকাংশ আসে সৈনিক হিসাবে আর অবশিষ্টাংশ আসে আগের ধারায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। অবশ্য কেউ কেউ আসে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ও ভাগ্য অনুসন্ধানে।
তুর্কিস্তানের খালজ বংশোদ্ভুত মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী দিল্লীর তদানীন্তন সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেকের আমলে ১১৯৮ সাল মোতাবেক ৫৯১ হিজরীতে তার সেনাবাহিনী নিয়ে বাংলায় প্রবেশ করেন। তিনিই ছিলেন প্রথম মুসলিম সেনাপতি যিনি বাংলার পশ্চিমাঞ্চলে ইসলামের সদর্প আবির্ভাব ঘটান। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় একে একে মুসলিম বসতি ও স্থাপনার বিস্তার হতে থাকে। ১২০৩ সালে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজী বাংলার রাঢ় ও বরেন্দ্র অঞ্চল অধিকার করেন।
(ডঃ আব্দুল করিম, প্রফেসর এ্যামিরিটাস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান এবং বাংলাদেশ, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ২০০২, পৃষ্ঠা-৩)
পৃথিবীতে মানুষের সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য ইসলাম দিয়েছে পূর্ণ গ্যারান্টি। এতে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার ব্যাপারে চমৎকার দিক-নির্দেশনা রয়েছে এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনও করা হয়েছে। কেবল জাতিসংঘ সনদে নয়, অন্য কোন ধর্মেও এতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,
তিনি আরো বলেন,
যুদ্ধাবস্থায়ও নিরপরাধ মানুষ হত্যা অবৈধ
মানবতার লালন ও সংরক্ষণের প্রতি ইসলামের এতই সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি যে যুদ্ধাবস্থায়ও সে মানবাধিকারের প্রতি পুরোপুরি লক্ষ রাখার শিক্ষা দেয়। প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) যখন সিরিয়ায় সেনা পাঠান তখন তাদের ১০টি নির্দেশ দিয়ে দেন। সে নির্দেশ ছিল এই
১. নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের কেউ যেন হত্যা না করে।
২. লাশ যেন বিকৃত করা না হয়।
৩. আশ্রম, প্যাগোডা ও কুঠরিতে উপাসনারত সন্ন্যাসী ও তপস্বীদের কষ্ট দেওয়া যাবে না। কোনো উপাসনালয় ভাঙা যাবে না।
৪. ফলবান বৃক্ষ যেন কেউ না কাটে এবং ফসলের ক্ষেত যেন পোড়ানো না হয়।
৫. জনবসতিগুলোকে (সন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে) যেন জনশূন্য না করা হয়।
৬. পশুদের যেন হত্যা করা না হয়।
৭. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা চলবে না।
৮. যারা আনুগত্য স্বীকার করবে তাদের জানমালকে মুসলমানদের জানমালের মতো নিরাপত্তা দিতে হবে।
৯. গণিমতের সম্পত্তি যেন আত্মসাৎ করা না হয়।
১০. যুদ্ধে যেন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা না হয় (মুসান্নাকে ইবনে আবি শায়বাহ : ষষ্ঠ খণ্ড, পৃ: ৪৮৭-৪৮৮)
এ নির্দেশাবলি অধ্যয়ন করলে বোঝা যায় যে ইসলাম যুদ্ধকে সব হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে পবিত্র করে দিয়েছিল। অথচ সে সময়ে হিংসাত্মক কার্যকলাপ ছিল যুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজেই জিহাদ বা ধর্মযুদ্ধের নামেও নিরীহ মানুষ হত্যা করা ইসলাম সম্মত নয়।
মানুষের জীবনের মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, হে লোক সকল! তোমাদের জান-মাল, ইয্যত আব্রুর উপর হস্তক্ষেপ তোমাদের জন্য হারাম করা হ’ল। তোমাদের আজকের এই পবিত্র দিন, এই পবিত্র (যিলহজ্জ) মাস, এই শহর (মক্কা) যেমন পবিত্র ও সম্মানিত অনুরূপভাবে উপরোক্ত জিনিসগুলোও সম্মানিত ও পবিত্র। সাবধান আমার পরে তোমরা পরস্পরের হন্তা হয়ে কাফেরদের দলভুক্ত হয়ে যেও না’।
প্রায় সব ইতিহাসবিদই এই মর্মে একমত যে, ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়েই বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা হয় এবং প্রধানত ঐ সময় থেকেই অব্যাহত গতিতে ভারতের পশ্চিমাঞ্চল, আফগানিস্তান, ইরান, আরব ও তুরস্ক থেকে অসংখ্য মুসলমান বাংলায় আগমন করতে থাকেন। এদের অধিকাংশ আসে সৈনিক হিসাবে আর অবশিষ্টাংশ আসে আগের ধারায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। অবশ্য কেউ কেউ আসে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ও ভাগ্য অনুসন্ধানে।
তুর্কিস্তানের খালজ বংশোদ্ভুত মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী দিল্লীর তদানীন্তন সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেকের আমলে ১১৯৮ সাল মোতাবেক ৫৯১ হিজরীতে তার সেনাবাহিনী নিয়ে বাংলায় প্রবেশ করেন। তিনিই ছিলেন প্রথম মুসলিম সেনাপতি যিনি বাংলার পশ্চিমাঞ্চলে ইসলামের সদর্প আবির্ভাব ঘটান। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় একে একে মুসলিম বসতি ও স্থাপনার বিস্তার হতে থাকে। ১২০৩ সালে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজী বাংলার রাঢ় ও বরেন্দ্র অঞ্চল অধিকার করেন।
(ডঃ আব্দুল করিম, প্রফেসর এ্যামিরিটাস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান এবং বাংলাদেশ, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ২০০২, পৃষ্ঠা-৩)
ইসলামে মানব মর্যাদাঃ
ইসলামে মানুষকে 'আশরাফুল মাখলুকাত' বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي
الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ
عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً
নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি
তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ
প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।(সুরা : বনি ইসরাইল, আয়াত : ৭০)। এ ছাড়া
বুদ্ধি ও চেতনায় মানুষকে বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দান করা হয়েছে। এর সাহায্যে যে
সমগ্র ঊর্ধ্বজগৎ ও অধঃজগৎকে নিজের কাজে নিয়োজিত করতে পারে। পবিত্র কোরআনে
এরশাদ হয়েছে : 'এবং তিনি তোমাদের জন্য অধীন ও আজ্ঞাবহ করেছেন আসমান ও
জমিনের সব কিছু।মানুষের বংশপরম্পরাকে রক্ষা করার জন্য জিনা-ব্যভিচারের পথ
রুদ্ধ করে বৈবাহিক জীবনাচারের নির্দেশ প্রদান করেছে। মানুষের মেধা-মনন,
বিবেক-বুদ্ধি সতেজ ও পরিশোধিত রাখতে সব মাদকদ্রব্য নিষিদ্ধ করেছে। মানুষের
সম্পদকে রক্ষা করার জন্য সব রকমের চুরি, ডাকাতি, লুটতরাজ, সুদ, ঘুষ,
দুর্নীতি ও প্রতারণার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। এভাবেই ইসলাম মানুষকে মানবিক
মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত।
নিরপরাধ মানুষ হত্যা ইসলামে মহা-অপরাধপৃথিবীতে মানুষের সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য ইসলাম দিয়েছে পূর্ণ গ্যারান্টি। এতে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার ব্যাপারে চমৎকার দিক-নির্দেশনা রয়েছে এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনও করা হয়েছে। কেবল জাতিসংঘ সনদে নয়, অন্য কোন ধর্মেও এতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ كَتَبْنَا عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ
أَنَّهُ مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الأَرْضِ
فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا
أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا وَلَقَدْ جَاء تْهُمْ رُسُلُنَا بِالبَيِّنَاتِ
ثُمَّ إِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُم بَعْدَ ذَلِكَ فِي الأَرْضِ لَمُسْرِفُونَ
এ কারণেই আমি বনী-ইসলাঈলের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, যে
কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবাপৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা
করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন
সবার জীবন রক্ষা করে। তাদের কাছে আমার পয়গম্বরগণ প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী নিয়ে
এসেছেন। বস্তুতঃ এরপরও তাদের অনেক লোক পৃথিবীতে সীমাতিক্রম করে।
(মায়েদাহ ৩২)আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,
وَلاَ تَقْتُلُواْ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللّهُ
إِلاَّ بِالحَقِّ وَمَن قُتِلَ مَظْلُومًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيِّهِ
سُلْطَانًا فَلاَ يُسْرِف فِّي الْقَتْلِ إِنَّهُ كَانَ مَنْصُورًا
সে প্রাণকে হত্যা করো না, যাকে আল্লাহ হারাম করেছেন;
কিন্তু ন্যায়ভাবে। যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়, আমি তার উত্তরাধিকারীকে
ক্ষমতা দান করি। অতএব, সে যেন হত্যার ব্যাপারে সীমা লঙ্ঘন না করে। নিশ্চয়
সে সাহায্যপ্রাপ্ত।
তিনি আরো বলেন,
وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَآؤُهُ
جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ
لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا
যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাক্রমে মুসলমানকে হত্যা করে, তার
শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ
হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্যে ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত
রেখেছেন।
(নিসা ৯৩)যুদ্ধাবস্থায়ও নিরপরাধ মানুষ হত্যা অবৈধ
মানবতার লালন ও সংরক্ষণের প্রতি ইসলামের এতই সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি যে যুদ্ধাবস্থায়ও সে মানবাধিকারের প্রতি পুরোপুরি লক্ষ রাখার শিক্ষা দেয়। প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) যখন সিরিয়ায় সেনা পাঠান তখন তাদের ১০টি নির্দেশ দিয়ে দেন। সে নির্দেশ ছিল এই
১. নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের কেউ যেন হত্যা না করে।
২. লাশ যেন বিকৃত করা না হয়।
৩. আশ্রম, প্যাগোডা ও কুঠরিতে উপাসনারত সন্ন্যাসী ও তপস্বীদের কষ্ট দেওয়া যাবে না। কোনো উপাসনালয় ভাঙা যাবে না।
৪. ফলবান বৃক্ষ যেন কেউ না কাটে এবং ফসলের ক্ষেত যেন পোড়ানো না হয়।
৫. জনবসতিগুলোকে (সন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে) যেন জনশূন্য না করা হয়।
৬. পশুদের যেন হত্যা করা না হয়।
৭. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা চলবে না।
৮. যারা আনুগত্য স্বীকার করবে তাদের জানমালকে মুসলমানদের জানমালের মতো নিরাপত্তা দিতে হবে।
৯. গণিমতের সম্পত্তি যেন আত্মসাৎ করা না হয়।
১০. যুদ্ধে যেন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা না হয় (মুসান্নাকে ইবনে আবি শায়বাহ : ষষ্ঠ খণ্ড, পৃ: ৪৮৭-৪৮৮)
এ নির্দেশাবলি অধ্যয়ন করলে বোঝা যায় যে ইসলাম যুদ্ধকে সব হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে পবিত্র করে দিয়েছিল। অথচ সে সময়ে হিংসাত্মক কার্যকলাপ ছিল যুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজেই জিহাদ বা ধর্মযুদ্ধের নামেও নিরীহ মানুষ হত্যা করা ইসলাম সম্মত নয়।
হত্যা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হুঁশিয়ারী :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিনা কারণে মানুষ হত্যাকে কবীরা গুনাহ বলেছেন। তিনি মারামারি ও সশস্ত্র ঝগড়া বিবাদ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। কেননা তাতে অকারণ ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও মানবহত্যা সংঘটিত হয়ে যেতে পারে, যা কোনক্রমেই কাম্য নয়।মানুষের জীবনের মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, হে লোক সকল! তোমাদের জান-মাল, ইয্যত আব্রুর উপর হস্তক্ষেপ তোমাদের জন্য হারাম করা হ’ল। তোমাদের আজকের এই পবিত্র দিন, এই পবিত্র (যিলহজ্জ) মাস, এই শহর (মক্কা) যেমন পবিত্র ও সম্মানিত অনুরূপভাবে উপরোক্ত জিনিসগুলোও সম্মানিত ও পবিত্র। সাবধান আমার পরে তোমরা পরস্পরের হন্তা হয়ে কাফেরদের দলভুক্ত হয়ে যেও না’।
মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতিশোধ না নেয়া :
৬৩০ সালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কা বিজয়ের সময় কাফির-কুরায়েশদের উপর কোন রূপ
প্রতিশোধ নেননি। মক্কাতে এমনকি মদীনায় হিজরতের পরও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর
উপর কুরায়েশ ও কাফিররা লোমহর্ষক নির্যাতন-নিপীড়ন, চালিয়েছিল। তারা তাঁকে
(ছাঃ) হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল, ছাহাবীদের ওপর অত্যাচারের স্টীম রোলার
চালিয়েছিল ও কোন কোন ছাহাবীকে হত্যা করেছিল, যা ইতিহাসের পাতায় নির্মমতার
নযীর হিসাবে ভাস্বর হয়ে রয়েছে। মক্কা বিজয় করলেন রাসূল (ছাঃ)। তিনি তাদের
উপর কোনরূপ প্রতিশোধ না নেয়ার অঙ্গীকার করলেন। অতঃপর তিনি (ছাঃ)
সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত ফরমান জারী করেন :
১. যারা অস্ত্র সমর্পণ করবে তাদের হত্যা করবে না।
২. যে ব্যক্তি কা‘বা ঘরের অভ্যন্তরে আশ্রয় নেবে তাকে হত্যা করবে না।
৩. যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়ীতে আশ্রয় নেবে তাকে হত্যা করবে না।৪. যে ব্যক্তি নিজের বাড়ীতে বসে থাকবে তাকে হত্যা করবে না।
৫. যে হাকীম ইবনে হিযামের বাড়ীতে আশ্রয় নেবে তাকে হত্যা করবে না।
৬. পলায়নকারীদের পিছু ধাওয়া করবে না।
৭. আহত ব্যক্তিদের হত্যা করবে না।
রাসূল (ছাঃ) বিশ্ব দাবারে মানুষের জীবনের স্বাধীনতা ও ক্ষমা প্রদর্শনের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।



No comments